দেশের অর্থনীতির সামনে কি আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে? একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নতুন হিসাব বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধির এই হার বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের দেওয়া হিসাবের চেয়েও কম। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাবে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ। তবে সরকারের বাজেটে এই অর্থবছরের জন্য ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সরকারের প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত এপ্রিলে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। কিন্তু নতুন হিসাবে সেই পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। নতুন পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে প্রবৃদ্ধি সেই সময়ের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে। এমনকি করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশের ওপরে ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, একই অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ এবং ভুটানের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যে দুর্বল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতার মতো আন্তর্জাতিক কারণ অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। তবে এসব সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়; অন্যান্য দেশও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার জন্য কেবল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করা যাবে না। রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের বাধা দূর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার যথেষ্ট এগোয়নি। এসব সমস্যার সমাধান না হলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, মানসম্মত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি থাকুক বা না থাকুক, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এসব সংস্কার এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস আর সরকারের লক্ষ্যমাত্রার এই ব্যবধান কমাতে কার্যকর সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আস্থা ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভব হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশের অর্থনীতির আগামী দিনের গতিপথ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন