জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স। রাজপথে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট, এমনকি ঐতিহাসিক একটি নগর ভবনেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে একদিনেই প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডার্ম সদস্য। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে পুলিশের পদক্ষেপের বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কেন হঠাৎ এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠল ফ্রান্সের রাজনীতি ও রাজপথ?
রোববার, ১৮ অক্টোবর, দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রাজধানী প্যারিসের রিপাবলিক স্কয়ারসহ লিয়ন ও অন্যান্য শহরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে। জবাবে বিক্ষোভকারীদের একাংশ ইট-পাটকেল ছোড়ে। কয়েকটি স্থানে দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে লিমোজেস শহরে। সেখানে উনিশ শতকের ঐতিহ্যবাহী নগর ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সহিংসতায় বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। সাঁ-তেতিয়েনে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বোমার বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মুলহাউসে এক কিশোরী চোখ হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, বৈধ দাবি নিয়ে আন্দোলন করা মানুষদের সঙ্গে ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতায় জড়িতদের এক করে দেখা যাবে না। একই সঙ্গে সহিংসতায় অংশ নেওয়া অপরাধী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি। তবে এত বড় অস্থিরতার মধ্যেও জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেননি ফরাসি প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডার্ম সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ম্যাক্রোঁ।
ফ্রান্সের সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থাকায় এই অস্থিরতা রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। উগ্র ডানপন্থী জাতীয় সমাবেশ দলের নেত্রী মারিন ল্য পেন ও তাঁর সহযোগী জর্ডান বারদেলা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলেনশঁ বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি সরকারের সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সহিংসতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে মন্তব্য করেছেন।
সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন ফ্রান্সের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনঅসন্তোষের বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সরকার একদিকে সহিংসতা দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে বৈধ আন্দোলনকারীদের দাবি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন