রাজধানীর বাসযাত্রায় কি এবার ফিরবে শৃঙ্খলা? দীর্ঘদিনের যানজট, একই সড়কে অসংখ্য বাসের প্রতিযোগিতা আর যাত্রী ওঠানামার বিশৃঙ্খলা কমাতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকার বর্তমান ৯৮টি বাস রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি সমন্বিত রুটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আজ রবিবার প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি রুটে নতুন বাসসেবা চালু হচ্ছে।
সকাল ১১টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে এই বাসসেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাস রুট পুনর্বিন্যাস কার্যক্রমের আওতায় নেওয়া হয়েছে এই উদ্যোগ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং যানবাহন চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করেই নতুন রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের যানবাহনের চাপ বুঝতে ড্রোনের সাহায্যেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
রাজধানীর বাস রুট পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১১ সালে প্রথম এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০১৯ সালে পুরোনো সমীক্ষা পর্যালোচনা করে নতুন করে কাজ শুরু হয়। প্রথমে ৪২টি রুটের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, দুই সিটি করপোরেশন এবং বাস মালিক-শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা শেষে ৩২টি রুটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন রুট নির্ধারণে নেওয়া হয়েছে বড় পরিসরের জরিপ। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চালু থাকা ৯৮টি রুটের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিটি রুটে ১৮টি ট্রিপের যাত্রী ওঠানামার হিসাব নেওয়া হয়েছে। সংগ্রহ করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর তথ্য। পাশাপাশি ৩৫ হাজারেরও বেশি বাসযাত্রীর যাত্রা শুরুর স্থান ও গন্তব্য নিয়ে জরিপ চালানো হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর ৭২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়েছে। প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের অবকাঠামোগত অবস্থাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয়েছে ড্রোনের ছবি ও বিশেষ পরিবহন মডেল। প্রাথমিক পর্যায়ে যে ছয়টি রুটে বাস চলবে, তার মধ্যে রয়েছে গাজীপুরের শিববাড়ী চৌরাস্তা থেকে আব্দুল্লাহপুর হয়ে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত। মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে সায়েন্সল্যাব হয়ে চুলকুটিয়া পর্যন্তও চালু হবে বাসসেবা।
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরের বসিলা থেকে শাহবাগ ও মৎস্য ভবন হয়ে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত একটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। বসিলা থেকে সায়েন্সল্যাব ও জিগাতলা হয়ে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড এবং কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত চলবে আরেকটি রুট। এ ছাড়া ঘাটারচর থেকে মিরপুর-১০ হয়ে আব্দুল্লাহপুরের ধউর ব্রিজ এবং টঙ্গী কলেজগেট থেকে আব্দুল্লাহপুর হয়ে আজিমপুর পর্যন্ত বাস চলাচল করবে। যাত্রীসংখ্যা ও চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি রুটে ৭০ থেকে ২৫০টি পর্যন্ত শীতাতপনিয়ন্ত্রণবিহীন বাস চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি টঙ্গী কলেজগেট থেকে আজিমপুর পর্যন্ত ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে ২০টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর বাইরে ফার্মগেট-পলাশী, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় তিনটি চক্রাকার বাসসেবা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রতিটি চক্রাকার রুটে ২০টি করে বাস রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, ৯৮টি রুটকে ৩২টিতে নামিয়ে আনার এই পরিকল্পনা রাজধানীর গণপরিবহনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে নতুন রুট চালুর পাশাপাশি বাসের সময়সূচি, নির্দিষ্ট স্টপেজ, ভাড়া এবং মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে সমন্বয় ঠিকভাবে নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সফলতা।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন