মিরপুরে দুই ইনিংসেই দায়িত্বহীন শট খেলে উইকেট হারিয়েছিলেন তাওহিদ হৃদয়। তাঁর সেই ব্যাটিংয়ে দলের বিপদ বাড়ার পাশাপাশি চারদিক থেকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সিলেটে এসেও অনুশীলনে তাঁর ব্যাটিং দেখে খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারেননি অনেকে। এমনকি প্রশ্ন উঠেছিল টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর সামর্থ্য নিয়েও। তবে সব প্রশ্ন, সংশয় ও সমালোচনার জবাব দেওয়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত মঞ্চ আর হতে পারত না। সিলেটের মাঠে ব্যাট হাতে হৃদয় প্রমাণ করলেন, সমালোচনায় ভেঙে পড়ার মতো ক্রিকেটার তিনি নন। নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে রূপ দিলেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। সতীর্থদের ব্যর্থতার মধ্যেও একাই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের ভরসা। সিলেটের আকাশ তখন ঝকঝকে রোদে উজ্জ্বল। কিন্তু বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। উইকেটে ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের ব্যাটিং। একপর্যায়ে ১৭৯ রানেই ছয় উইকেট হারিয়ে চরম চাপে পড়ে স্বাগতিকরা। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে এক প্রান্ত আগলে রেখেছিলেন হৃদয়। তৃতীয় দিনের সকালে ২৯ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামেন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে করা ৩৫৬ রানের জবাবে বাংলাদেশের ব্যাটাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাচ্ছিলেন। মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ—কেউই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই বিপর্যয়ের মধ্যেই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন হৃদয়। লেজের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে নিতে থাকেন দলকে। বিশেষ করে তাইজুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ১১৭ রানের অষ্টম উইকেট জুটি ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেয়। ৫৬ বল মোকাবিলা করে ২২ রান করা তাইজুলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এক প্রান্ত ধরে রেখে হৃদয়কে নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলার সুযোগ করে দেন তিনি। শেষ স্বীকৃত ব্যাটার মেহেদী হাসান মিরাজ আউট হওয়ার পরও থেমে যাননি হৃদয়। লেজের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই অব্যাহত রাখেন। দলের অন্যরা যেখানে উইকেট হারিয়ে ফিরে গেছেন, সেখানে দৃঢ়তা দেখিয়ে ক্রিজে টিকে ছিলেন এই ডানহাতি ব্যাটার। লাঞ্চ বিরতির আগেই ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতকের দেখা পান হৃদয়। এরপর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে তাঁর ব্যাটিং। কখনো কাভারের ফাঁক দিয়ে সীমানা পার করেছেন বল, আবার কখনো পুল ও ফ্লিক শটে বোলারদের ওপর চড়াও হয়েছেন। জোমেল ওয়ারিক্যান, রোস্টন চেজ কিংবা শামার জোসেফ—কেউই তাঁর আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি। দ্বিতীয় সেশনে হৃদয়ের ব্যাটে বদলে যায় ম্যাচের গতিপথ। চা-বিরতির আগে ২৮৯ বলে ১৯০ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। এর মধ্যেই মুমিনুল হকের করা ১৮১ রানের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান। প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতেই বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক হওয়ার পথে এগিয়ে যান হৃদয়। একই সঙ্গে ভেঙে দেন সিলেট স্টেডিয়ামে আগের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড। এরপর অপেক্ষা ছিল আরও বড় এক মাইলফলকের।
ইনিংসের ৯৯তম ওভারে জোমেল ওয়ারিক্যানের বলে এক রান নিয়ে ৩০৩ বলে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন হৃদয়। গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস, সতীর্থরা অভিনন্দন জানান তাঁকে, আর ড্রেসিংরুমে ফিরে আসে স্বস্তি। নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হলেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটারও এখন হৃদয়। এর আগে এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। এই ইনিংসে আরও বেশ কয়েকটি রেকর্ড গড়েছেন হৃদয়। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্টে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস এখন তাঁর দখলে। এর আগে এই মাঠে সর্বোচ্চ ১৭১ রান করেছিলেন মাহমুদুল হাসান জয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংসের রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। এক ইনিংসে আটটি ছক্কা হাঁকিয়ে পেছনে ফেলেছেন তামিম ইকবালের আগের রেকর্ড। তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের বাইরেও হৃদয়ের এই ইনিংসের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, লেজের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই করে তিনি বাংলাদেশকে আবার ম্যাচে ফিরিয়েছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একাই দলের হাল ধরেছেন এই ব্যাটার। মিরপুরের ব্যর্থতার পর সিলেটে তাঁর এই অসাধারণ প্রত্যাবর্তন যেন সমালোচকদের উদ্দেশে এক শক্ত জবাব। কোনো কথায় নয়, ব্যাট হাতেই নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন তাওহিদ হৃদয়।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন