ঢাকা | |

জ্বালানিসংকট ও সরকারের দায়

বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমতির দিকে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম এক
  • আপলোড সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:৯ সময়
  • আপডেট সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:৯ সময়
জ্বালানিসংকট ও সরকারের দায়

বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমতির দিকে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দামে অন্যতম বড় উল্লম্ফন। ফলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সময় দেশীয় বাজারে এত বড় মূল্যবৃদ্ধির কারণ কী? গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।


কিন্তু নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিনই আন্তর্জাতিক বাজারে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ২১ সেপ্টেম্বর সকালে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ১৬ ডলার কমে ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে মার্কিন পশ্চিম টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ২ দশমিক ১৫ ডলার কমে দাঁড়ায় ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাজারে যখন দাম বাড়ানো হচ্ছে, তখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নিম্নমুখী। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। সেই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।


তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংঘাতের আশঙ্কায় ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের বেশি উঠেছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা কিছুটা কমে আসে। ১৭ সেপ্টেম্বর ব্রেন্টের দাম নেমে আসে প্রায় ১০৪ দশমিক ৫৯ ডলারে। এরপর ২০ ও ২১ সেপ্টেম্বরও দাম কমার প্রবণতা দেখা যায়। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সর্বশেষ পরিস্থিতি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দ্রুত দেশীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ছে, কিন্তু দাম কমার ক্ষেত্রে একই গতিতে সেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে কি না—তা নিয়ে রয়েছে আলোচনা।


বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ কয়েকটি বামপন্থী রাজনৈতিক দল এই মূল্যবৃদ্ধির সমালোচনা করেছে। তাদের বক্তব্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে বিভিন্ন কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোতে তুলনামূলক কম দামের কারণে বাংলাদেশ থেকে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতেও মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে।


বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক ও বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে মাসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে এই হিসাবের ক্ষেত্রে কোন সময়ের আন্তর্জাতিক গড় দাম ধরা হচ্ছে, কোন সময়ের বিনিময় হার ব্যবহার করা হচ্ছে এবং শোধন ও পরিবহন ব্যয়ের কী ধরনের উপাত্ত বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে—এসব তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সবসময় স্পষ্ট থাকে না। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। একটি স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা থাকলেও সেই ব্যবস্থার সূত্র, উপাত্ত এবং হিসাবের ধাপগুলো জনগণের কাছে স্পষ্ট না হলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটাই অস্বচ্ছ থেকে যায়।


জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দাম বাড়ানোর সময় অনেক ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মূল্যবৃদ্ধির উদাহরণ সামনে আনা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে একই দেশগুলোর বাজারে দাম কীভাবে কমছে, সেই তুলনাটি কতটা নিয়মিতভাবে করা হচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আরেকটি বড় বিষয় হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত সরাসরি পরিবহন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। তাই এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণের সূত্র ও উপাত্ত প্রকাশ, সংসদীয় পর্যায়ে পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিদের মতামত এবং অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।


কারণ জ্বালানি তেলের মূল্য শুধু একটি পণ্যের দাম নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবহন খরচ, পণ্য উৎপাদন, কৃষি, বিদ্যুৎ, ব্যবসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার। ফলে লিটারপ্রতি ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষভাবে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের ওপর পড়তে পারে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সময় বাংলাদেশে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারের দেওয়া ব্যাখ্যার পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের সূত্র, ব্যবহৃত উপাত্ত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে কি না—এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
ভিডিও ভাইরালের পর ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ থেকে বাদ পড়ছেন পাভেল?

ভিডিও ভাইরালের পর ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ থেকে বাদ পড়ছেন পাভেল?