বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে ঘিরে এবার বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকটের ইঙ্গিত মিলেছে। ফিফার শাসনব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কারের দাবি তুলে একজোট হয়েছে ইউরোপের চার শীর্ষ ফুটবল লিগ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, স্পেনের লা লিগা, ইতালির সিরি আ এবং জার্মানির বুন্দেসলিগা যৌথভাবে ফিফার বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে তীব্র অসন্তোষ জানিয়েছে। শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে চার লিগ বলেছে, ফিফার সাংবিধানিক কাঠামোর সীমা আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এমন সংস্কার দরকার, যাতে ফিফার ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো যায় এবং ব্যক্তিবিশেষের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকে।
এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি বিশেষ বাণিজ্যিক সত্তা গঠনের উদ্যোগ। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপে বেসরকারি অর্থায়ন যুক্ত করার কথা ছিল। এতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে ফুটবলাঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তীব্র আপত্তির মুখে ফিফা শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প স্থগিত রাখে। ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে পরামর্শ করে সংস্কারের একটি রূপরেখা তৈরির কথা বললেও ইউরোপের চার শীর্ষ লিগ এটিকে যথেষ্ট মনে করছে না।
চার লিগের বক্তব্য, ফিফা সভাপতি এখন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নিয়ে বিতর্কের পর শুধু প্রক্রিয়াগত কিংবা ওপর ওপর কিছু পরিবর্তন করলে সমস্যার সমাধান হবে না। তারা এই প্রকল্পকে ফিফার ইতিহাসে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অপব্যবহারের ঘটনাগুলোর একটি হিসেবেও উল্লেখ করেছে। তবে চার লিগ সরাসরি পুরো পরিস্থিতির দায় শুধু ইনফান্তিনোর ওপর চাপায়নি। তাদের বক্তব্য, ফিফার শাসনব্যবস্থার সমস্যা একজন ব্যক্তির ভূমিকার চেয়েও অনেক বড়। এ কারণেই তারা ফুটবলের বিভিন্ন পক্ষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
চার লিগের প্রস্তাব অনুযায়ী, পুরুষ ও নারী ফুটবলের জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, লিগ, ক্লাব এবং খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্থায়ী সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। ফিফা নতুন কোনো বড় উদ্যোগ নেওয়ার আগে এই সংস্থাকে পুরোপুরি অবহিত করবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অর্থবহ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে সামনে রয়েছে ফিফা সভাপতি নির্বাচনও। আগামী ২০২৭ সালের ১৮ মার্চ এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। চার লিগের দাবি, নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তাদের বিজয়ী হওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করতে হবে।
আগামী ১৮ নভেম্বর চূড়ান্ত মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। তবে এখন পর্যন্ত বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোই একমাত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। ফিফার প্রশাসন নিয়ে অসন্তোষ অবশ্য শুধু ইউরোপের চার লিগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে গত আগস্টে ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনক্যাক্যাফ এবং এশিয়ার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এএফসি যৌথ চিঠিতে ইনফান্তিনোর ক্ষমতা ব্যবহারের সমালোচনা করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, ফুটবলের নেতৃত্ব কোনো এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না।
তবে ফিফা সভাপতির প্রতি সমর্থনও রয়েছে। ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরব, আফ্রিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএএফ এবং দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। ফলে ফিফার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে ফুটবলের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য এখন প্রকাশ্য। একদিকে ইউরোপের প্রভাবশালী চার লিগ মৌলিক সংস্কারের দাবি তুলেছে, অন্যদিকে কয়েকটি মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন ধরে রেখেছে। আগামী ফিফা সভাপতি নির্বাচন এবং এর আগে প্রস্তাবিত সংস্কার নিয়ে আলোচনা তাই বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন