ঢাকার ভোর পাঁচটা। আর ঠিক সেই সময় আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে রাত নামবে এমন এক মুহূর্ত নিয়ে, যার অপেক্ষা হয়তো কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী দীর্ঘদিন ধরে করছেন। আকাশি-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো দেশের হয়ে মাঠে নামতে পারেন লিওনেল মেসি। প্রতিপক্ষ বেনিন, ভেন্যু বিখ্যাত এস্তাদিও মনুমেন্টাল। কাগজে-কলমে এটি একটি প্রীতি ম্যাচ। কিন্তু আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে এক যুগের অবসানের আবেগঘন রাত। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খেলেছেন মেসি। দেশের হয়ে ২০৭ ম্যাচে করেছেন ১২৫ গোল। জাতীয় দলের হয়ে গোলের দিক থেকে তিনিই সর্বোচ্চ। তার হাত ধরেই এসেছে দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা এবং সবচেয়ে বড় অর্জন—২০২২ সালের বিশ্বকাপ। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন মেসি। ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকাতেও তিনি অনন্য—জিতেছেন রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর।
এবার সেই কিংবদন্তিকে নিজের দেশের মাটিতে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছে আর্জেন্টিনা। দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর মেসি অনুশীলন করেছেন সতীর্থদের সঙ্গে। অনুশীলনের পর ছিল দলীয় আসাদো বা বারবিকিউ আয়োজন। মাঠের বাইরেও যেন তৈরি হয়েছে বিদায়ের আবহ। কোচ লিওনেল স্কালোনির দলও আছে দুর্দান্ত ছন্দে। বলিভিয়াকে তারা হারিয়েছে চার-শূন্য গোলে, আর বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে পেয়েছে সাত-শূন্য গোলের বড় জয়।
তবে এসবের কোনোটিই এখন মূল আকর্ষণ নয়। সবার চোখ একজনের দিকে—লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া জানিয়েছেন, মেসিকে তার দেশের মাটিতে প্রাপ্য বিদায় দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আর সেই বিদায় দেখতে মনুমেন্টালে জড়ো হতে পারেন প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক। আতশবাজি, স্মারক জার্সি, বিশেষ আয়োজন—সব মিলিয়ে পুরো স্টেডিয়ামকে সাজানো হচ্ছে মেসিকে ঘিরে।
মাঠে মেসির পাশে থাকবেন জিওভানি লো সেলসো, রদ্রিগো দে পল ও নিকোলাস ওটামেন্দি। গ্যালারি থেকে সতীর্থ অধিনায়ককে বিদায় জানাবেন লেয়ান্দ্রো পারেদেস। বিশ্বকাপের পর ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে মাঠে নামতে না পারলেও, এই বিশেষ রাতে মেসির পাশে থাকতে চান তিনি। তবে এই বিদায়ের আয়োজন নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। ফরাসি অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোমা মোলিনা দাবি করেছেন, মেসিকে ঝুঁকিমুক্ত বিদায় দিতে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ বেছে নিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা। তার আরও অভিযোগ, বেনিনের খেলোয়াড়দের দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হয়েছে এবং দলের প্রস্তুতি নিয়েও ছিল নানা সমস্যা। টিকিটের চড়া দাম নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। তবে এসবই এখন পর্যন্ত অভিযোগ ও দাবি—যার সবগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
সমালোচকদের বক্তব্য, মেসির মতো একজন কিংবদন্তি আরও কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। অন্যদিকে বেনিনও জানিয়ে দিয়েছে, তারা শুধু আনুষ্ঠানিকতা করতে আসেনি। দলের গোলরক্ষক মার্সেল দানজিনু বলেছেন, প্রয়োজনে মেসির পেনাল্টিও ঠেকাতে প্রস্তুত তারা। কিন্তু ম্যাচের ফলাফল হয়তো এই রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কারণ মনুমেন্টালে ৮৫ হাজার মানুষ একসঙ্গে দাঁড়াবেন একটি মানুষকে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখার জন্য।
বুয়েনস আইরেসেও চলছে বিশেষ আয়োজন। স্থানীয় সময় দুপুর থেকে শুরু হবে ‘গ্রাসিয়াস, লিও’ নামে বিশেষ ফ্যান ফেস্ট। থাকবে সংগীত, বিনোদন, খাবার, খেলাধুলা ও নানা ইন্টারেক্টিভ আয়োজন। উপস্থিত থাকবেন বিভিন্ন অঙ্গনের তারকারা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় মুখ ও স্ট্রিমাররা। শুধু স্টেডিয়ামেই নয়, পুরো শহরেই ছড়িয়ে দেওয়া হবে এই বিদায়ের আবেগ। বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া মাঠে বড় পর্দায় সরাসরি দেখানো হবে আর্জেন্টিনা ও বেনিনের ম্যাচ।
একসময় যে ছেলেটি আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, সেই মেসিই আজ দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলোর একটির শেষ পাতায় দাঁড়িয়ে। বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন, অসংখ্য রাতকে স্মরণীয় করেছেন, কোটি মানুষের আবেগের অংশ হয়েছেন। এবার হয়তো শুধু একটি প্রশ্ন—শেষবার যখন আকাশি-সাদা জার্সিতে মাঠ ছাড়বেন মেসি, তখন মনুমেন্টালের সেই ৮৫ হাজার মানুষ কি চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন?
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন