মাত্র ৯ দিনের এক নবজাতক, অথচ জন্মের পঞ্চম দিন থেকেই জ্বরে ভুগছে সে। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা গেল, শিশুটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। শুধু তাই নয়, রক্তেও দেখা দিয়েছে সংক্রমণ। ছোট্ট রায়ানকে এখন কাচের বাক্সের ভেতরে রেখে চলছে চিকিৎসা। অন্যদিকে, সন্তানের এমন অবস্থায় উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে মায়ের। রায়ানের এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না একেবারে ছোট্ট শিশুরাও।
রাজধানীর শ্যামলী শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গত ১৭ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখা যায় নবজাতক রায়ানকে। তার মা লিমা আক্তার জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রায়ানের জন্ম হয়। এরপর বাসায় ফেরার পর থেকেই শিশুটির জ্বর শুরু হয়। জন্মের পঞ্চম দিন থেকে জ্বর চলতে থাকায় হাসপাতালে নেওয়া হলে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। একই সঙ্গে রক্তে সংক্রমণও ধরা পড়ে। বর্তমানে স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে তাকে।
রায়ানের মতো আরও অনেক শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে উদ্বিগ্ন অবস্থায় সময় কাটাচ্ছেন অভিভাবকেরা। ১০ মাস বয়সী শিশু তাওহিদকে নিয়ে মিরপুর থেকে হাসপাতালে এসেছেন তার মা আমেনা। জ্বরের পর শিশুটির শরীরে দেখা দিয়েছে ফুসকুড়ি। কিন্তু এই মায়ের ভয় আরও গভীর। কারণ, তাঁর প্রথম সন্তান মাত্র ৫৭ দিন বয়সে মারা গিয়েছিল। দ্বিতীয় সন্তানও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিন মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিল। চিকিৎসার পেছনে ধারদেনা করে ছয় লাখ টাকা খরচ করার পর এবার শিশুটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। তাই সন্তানের সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি। এদিকে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে চাপও বাড়ছে। চিকিৎসক ও নার্সদের সামলাতে হচ্ছে বিপুলসংখ্যক রোগী। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেও ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ছোট-বড় কোনো বয়সের মানুষই যেন এই সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে ১৭ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৮৫২ জন। অক্টোবরের প্রথম ১৭ দিনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩০ হাজার ৬৯২ জন। এই সময়ে মারা গেছেন ৯৭ জন।
চলতি বছরের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪২ জনে। এ বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ১০ হাজার ৩১২ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক লাখ চার হাজার ১৯৯ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন পাঁচ হাজার ৭৭১ জন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর পরিস্থিতি আরও খারাপ। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার ২৮০ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৪৩ জনের। অথচ চলতি বছর একই সময়ের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়েছে, আর মৃত্যুও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪২ জনে।
এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিজেদেরও নিতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
চিকিৎসকেরাও বলছেন, ডেঙ্গু শনাক্ত ও চিকিৎসায় দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক চিকিৎসক আতিকুল ইসলাম জানান, জ্বরের প্রথম এক থেকে তিন দিনের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডেঙ্গুর এনএস১ পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু শনাক্ত হলে শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে রোগের জটিল পর্যায়ে শিশুর রক্তচাপ কমে যাওয়া, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসা, বমি, খিঁচুনি কিংবা শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তপাতের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। তাই বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে নির্ধারণ করবেন। মাত্র ৯ দিনের রায়ান থেকে শুরু করে ১০ মাসের তাওহিদ—শিশুদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা পরিবারগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। তাই জ্বরকে অবহেলা না করা, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখার মাধ্যমেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন