একটি চায়ের কাপ বসানো থেকে কীভাবে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হলো, আর সেই আগুনের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো পর্যটকদের জনপ্রিয় একটি রিসোর্ট! সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়, এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন একই পরিবারের চারজন। আর তদন্তে সামনে আসছে রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে শনিবার সকালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রিসোর্টের রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় চা বসিয়ে এক কর্মী ঘুমিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো রিসোর্টে।
তিনতলা কাঠের এই ভবনের নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ, আর ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। আগুন লাগার পর রিসোর্টের অধিকাংশ কর্মী ও কয়েকজন অতিথি দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারলেও বেশ কয়েকজন কক্ষে আটকা পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তাই চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাতের যে তথ্য সামনে এসেছে, সেটিকেও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান, মিলিতা মেহেজাবিন, খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান ও নাফিসতা মীম, চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির এবং পাঁচ বছর বয়সী শিশু ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দুই নারী, একজন শিশু ও একজন পুরুষ। নিহতদের মরদেহের সঙ্গে পরিচয়ের মিল নিশ্চিত করার কাজও চলছে।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রিসোর্টে অবস্থান করা যশোরের একই পরিবারের চারজনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁদের নিখোঁজ থাকার ঘটনায় স্বজনদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ঘটনার পর রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়া ও তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় মামলা করেছে। এতে তানভীরকে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে আটক করার পর মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আরেক আসামির নাম প্রকাশ করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে মালিক তানভীরের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদের অবস্থানও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও বৈধ অনুমোদন নিয়ে পাওয়া তথ্য। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর ভবনটিকে অনিরাপদ উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালিত হচ্ছিল। নোটিশ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ বা সরিয়ে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রিসোর্টটি ২০২২ সালে জমি কেনার পর নির্মাণ করা হয় এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির কুকুর ও বিড়াল রাখা হয়েছিল। আগুন লাগার সময় কয়েকজন কর্মী পোষা প্রাণীগুলো নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তবে এই প্রাণীগুলোর কতগুলো শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং দায় নির্ধারণে জেলা প্রশাসনের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে মামলার আসামিদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আগুন লাগার সময় ভবনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, আগে সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও কেন রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল, আর এই ভয়াবহ প্রাণহানির জন্য দায়ী কারা? তদন্তের ফলেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, অগ্নিনিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন উপেক্ষা করলে তার মূল্য দিতে হতে পারে নিরীহ মানুষের জীবন দিয়ে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন