নির্বাচনে কি যোগ্যতা ও সততার চেয়ে অস্ত্র, অর্থ আর পেশিশক্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে—এমনই মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তাঁর সতর্কবার্তা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ঠিক না করলে শেষ পর্যন্ত গুন্ডাতন্ত্রই দেশ শাসন করে যাবে।
শনিবার, ১৭ অক্টোবর মধ্যরাতে নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা লেখেন তাসনিম জারা। পোস্টে তিনি অস্ত্র হাতে মানুষকে ধাওয়া করার একটি ভিডিওর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ভিডিওতে যাঁকে দেখা যাচ্ছে, তিনি সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী এবং ভিডিওটি তাঁর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা থেকেই প্রচার করা হয়েছে।
তাসনিম জারা প্রশ্ন তোলেন, প্রকাশ্যে এমন আচরণ করা একজন ব্যক্তি কীভাবে জনগণকে শাসন করার দায়িত্ব পান। তাঁর মতে, সমাজে যোগ্য ও দায়িত্বশীল মানুষের অভাব নেই। কিন্তু তাঁদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার বাস্তব সুযোগ নানা কারণে সীমিত হয়ে পড়েছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তাসনিম জারার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীকে শুরুতেই হাজার হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়। আরেকটি পথ হলো রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পাওয়া। কিন্তু দলগুলো কীভাবে এবং কাদের মনোনয়ন দেয়, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাসনিম জারা। তাঁর অভিযোগ, আইন মেনে চলা প্রার্থীদের নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে প্রচার চালাতে হয়। অন্যদিকে প্রভাবশালী প্রার্থীরা নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করলেও অনেক সময় কার্যকর নজরদারি দেখা যায় না। এতে সৎভাবে নির্বাচন করতে চাওয়া প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন বলে তিনি মনে করেন।
ভোটের দিনের পরিস্থিতি নিয়েও নিজের উদ্বেগ তুলে ধরেছেন তিনি। তাসনিম জারার ভাষ্য, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম ঠেকানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে প্রার্থীদের নিজেদের ভোট রক্ষা করতে গিয়ে পেশিশক্তির মোকাবিলা করতে হয়। এমনকি বৈধ পোলিং এজেন্টদেরও নানা অজুহাতে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অস্ত্র, অর্থ ও প্রভাব থাকা প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পান। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিক কিংবা যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের পক্ষে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। এরপর রাজনীতিতে ভালো মানুষ আসেন না কেন, কিংবা ভোটাররা কেন নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিনিধিকে বেছে নেন—এমন প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন।
নিজের বক্তব্যের শেষাংশে তাসনিম জারা প্রচলিত একটি স্লোগান—“১০টা হোন্ডা, ২০টা গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা”—উল্লেখ করে বলেন, এমন পরিস্থিতি বজায় রেখে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আশা করা যায় না। তাঁর মতে, নির্বাচনী ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন না হলে পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতির প্রভাব থেকেই যাবে। তবে তাসনিম জারার পোস্টে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য মূলত নির্বাচনে সমান সুযোগ, নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে তাসনিম জারার এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ নাগরিকের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত, নির্বাচনী আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না এবং ভোটের দিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন