২০২৯ সালের পর কি আপনার হাতে থাকা বাটন ফোনটি হঠাৎ অচল হয়ে যাবে? যে ফোন দিয়ে গ্রামের মানুষ কথা বলেন, পরিবারের খোঁজ নেন, জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ করেন—সেই পরিচিত ফোন ব্যবহারের দিন কি শেষ হতে চলেছে? বাংলাদেশের প্রায় ছয় কোটি টু-জি হ্যান্ডসেট নিয়ে তৈরি হয়েছে এমনই এক বড় প্রশ্ন। কারণ টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ধাপে ধাপে বন্ধ হয়ে যেতে পারে দেশের টু-জি নেটওয়ার্ক। কিন্তু সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, স্বল্প আয়ের মানুষ কি সহজে নতুন ফোন কিনতে পারবেন?
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসি দেশকে আধুনিক ফোর-জি প্রযুক্তির আওতায় আনতে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের পর থেকে নতুন টু-জি বাটন ফোনের মডেলের অনুমোদন দেওয়া হবে না। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের পর দেশে টু-জি ফোন উৎপাদন বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর একই বছরের ৩০ জুন থেকে বাজারে টু-জি ফিচার ফোন বিক্রি নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। সবশেষে, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে টু-জি সেবা পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশকে নতুন প্রযুক্তির ফোনে যেতে হবে। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত মোট হ্যান্ডসেটের প্রায় ৬৫ শতাংশই টু-জি বাটন ফোন। এসব ফোনের দাম প্রায় ৯৫০ টাকা থেকে শুরু। অন্যদিকে, সাশ্রয়ী ফোর-জি স্মার্টফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় সাড়ে নয় হাজার টাকা বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, যে মানুষটি এক হাজার টাকারও কম দামে ফোন কিনে ব্যবহার করতে পারেন, তাঁকে স্মার্টফোন কিনতে গেলে কয়েক গুণ বেশি অর্থ খরচ করতে হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামের মানুষ, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং যাঁরা শুধু কথা বলা ও খুদে বার্তা পাঠানোর জন্য ফোন ব্যবহার করেন, তাঁদের জন্য এই পরিবর্তন বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। তবে সরকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে পাঁচ হাজার টাকায় সাশ্রয়ী স্মার্টফোন বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, ফোনগুলো কতটা সহজলভ্য হবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে কি না—সেই প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল ফোন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সতর্ক করেছেন। মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাকারিয়া শহীদ মনে করেন, টু-জি বন্ধের উদ্যোগ ভালো হলেও খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করতে গেলে উল্টো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, দেশে বৈধভাবে টু-জি ফোন উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর বাজারে অবৈধ হ্যান্ডসেটের সরবরাহ বেড়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, একবারে সবকিছু বন্ধ না করে ধাপে ধাপে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোন বছরে কতটা অগ্রগতি হবে, সেটি ঠিক করে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদেরও দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
অন্যদিকে, বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টু-জি সেবা বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট পরামর্শ সরকারের কাছে পাঠানো হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বাটন ফোনের গড় ব্যবহারকাল প্রায় আড়াই বছর। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগেভাগেই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে নির্ধারিত সময়ের পরও বিপুলসংখ্যক মানুষ পুরোনো ফোন নিয়ে সমস্যায় না পড়েন। এদিকে, মোবাইল অপারেটরদের মতে, টু-জি নেটওয়ার্কের তরঙ্গ ফোর-জি ও ভবিষ্যতে ফাইভ-জি প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা গেলে নেটওয়ার্কের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বাংলালিংকের কর্মকর্তা তাইমুর রহমান জানিয়েছেন, টু-জি থেকে ফোর-জিতে গেলে তরঙ্গ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। রবির কর্মকর্তা সাহেদ আলমও মনে করেন, দ্রুত ফোর-জি প্রযুক্তিতে রূপান্তর অপারেটরদের জন্য ইতিবাচক হবে।
কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়ন আর সাধারণ মানুষের সামর্থ্য—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সবচেয়ে জরুরি। টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হতে পারে, তবে সাশ্রয়ী ফোনের বিকল্প, গ্রামাঞ্চলে নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক এবং অবৈধ হ্যান্ডসেট নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না হলে অনেক মানুষ সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই এখন দেখার বিষয়, ২০২৯ সালের মধ্যে টু-জি বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় সরকার কীভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। আধুনিক প্রযুক্তির পথে দেশ এগিয়ে যাবে, কিন্তু সেই যাত্রায় যেন সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীরা যোগাযোগের বাইরে পড়ে না যান—সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন