যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি বলেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ এই যুদ্ধ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নির্বাচনের পর একই বিষয় উল্লেখ করেছেন।
এর আগে ট্রাম্প নিজেও বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভ্যান্সের এমন বক্তব্যকে ইরান যুদ্ধের দায় থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই নিজেদের দখলে নিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রিপাবলিকানদের জন্য এটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর হোয়াইট হাউস থেকেও ট্রাম্পকে নিয়ে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ওভাল অফিসের ডেস্কের পেছনে কঠোর মুখে বসে থাকা ট্রাম্পের ছবি প্রকাশ করে বলা হয়, তিনি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপও বাড়েছে।
দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার ফলে এখন ডেমোক্র্যাটদের আইন প্রণয়ন, প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত এবং সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা বেড়েছে। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে তিনি প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। এদিকে নির্বাচনের ফলের পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। এক লিখিত বার্তায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীতে পরিবর্তন এলেই দেশটির আধিপত্যবাদী মনোভাব বদলে যাবে—এমন আশা করা ভুল।
ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, মার্কিন ভোটাররা মূলত যুদ্ধের বিরুদ্ধেই রায় দিয়েছেন। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেইও ট্রাম্পের সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে নির্বাচনের দিনও ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। সেখানে পরপর পাঁচটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। ট্রাম্পের দাবি, দ্বীপটিতে একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছিল এবং সেটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, কেশম দ্বীপের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চালকবিহীন বিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাঁর সরকার। আগে যেসব বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব ছিল না, সেগুলো নিয়েও আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারও পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাতারের দেওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব দুই পক্ষই পর্যালোচনা করছে। পাশাপাশি চীনও বলেছে, কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানো তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। অর্থাৎ, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়ে গেছে। নির্বাচনের ফলাফল তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমীকরণই বদলায়নি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: এএফপি, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন