দেশে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে ইয়াবার সহজলভ্যতা তরুণ সমাজের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন মনোরোগ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। মাদকাসক্তদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে অনলাইন জুয়ার বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, তরুণদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া ইয়াবা যেন একটি ‘টাইম বোমা’।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইয়াবাসহ কোনো ধরনের মাদক যাতে দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সীমান্তে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দেশের ভেতরেই ইয়াবা তৈরির কারখানার সন্ধান মিলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন কারখানা শনাক্ত করেছে। ফলে শুধু সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ নয়, দেশেই মাদক উৎপাদনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের দমনে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। মাদকের বিস্তার ঠেকানো সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলেও জানিয়েছেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও রাজধানী থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাদক ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী ও মূল হোতাদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদেরও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, বছিলা ও কামরাঙ্গীর চরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব এলাকার কিছু অংশে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদেরও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজান জানিয়েছেন, জেনেভা ক্যাম্পসহ মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলছে। মাদক ব্যবসায়ী, ক্রেতা, ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তার দাবি, এসব অভিযানের ফলে বর্তমানে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
এ ছাড়া মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, সবুজবাগ, মুগদা, খিলগাঁও, বাসাবো, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের সহজলভ্যতা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, চিকিৎসার জন্য আসা মাদকাসক্তদের মধ্যে ইয়াবায় আসক্তদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও কম নয়। একটি পরিবারের একজন সদস্য মাদকাসক্ত হলে পুরো পরিবারই সংকটে পড়ে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় অনেক মাদকাসক্ত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তবে মাদক সহজলভ্য থাকায় পুনরায় আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। মাদকাসক্ত বন্ধুদের সংস্পর্শেও অনেকে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যান। অধ্যাপক মোহিত কামাল আরও বলেন, শুধু সরকারের একার পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রায়হানুল ইসলামও তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, মাদকাসক্তদের মধ্যে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে মাদক নির্মূলের কোনো বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, রাজধানীসহ সারা দেশে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং সদস্য ও অন্যান্য অপরাধীদের তালিকা অনুযায়ী অভিযান চালানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দেশে মাদকের বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি তরুণ প্রজন্ম, পরিবার ও সমাজের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে কঠোর নজরদারি, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই এই ভয়াবহ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন