বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানো এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানো, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে নেওয়া হচ্ছে একাধিক উদ্যোগ।
স্বাস্থ্য খাতে চলমান সংকট মোকাবিলায় এবার এ যাবতকালের সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের সেবামুখী পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাম ও ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী রোগের বিস্তার। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশুদের চাপ বাড়তে থাকে। পাঁচ মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ৯০৮ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করলেও এখন নতুন করে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, হাম আক্রান্তদের বড় একটি অংশ টিকা নেয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ১০ লাখের বেশি নতুন টিকা দেওয়া হয়েছে। জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সুবিধা, শিশুদের জন্য ২৫ শয্যার পরিচর্যা কেন্দ্র এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য অতিরিক্ত ১৫টি শয্যা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট কাটাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আড়াই হাজার নার্স ও আড়াই হাজার কারিগরি কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৯৩০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের অনুমোদনও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছে, দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধেও নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা ও মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কোন চিকিৎসক কোথায় দায়িত্ব পালন করছেন, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণের জন্য অবস্থানভিত্তিক নজরদারি ও ডিজিটাল তথ্যপর্দা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, দ্রুত প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কাজ শুরু করা হবে। অনুমোদিত ১৫ হাজার ৮০০-এর বেশি শূন্য পদ পূরণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার কথা রয়েছে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন। এ ছাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রী ও সাইকেল দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রত্যেক নাগরিককে ই-হেলথ কার্ড দেওয়া, জটিল রোগের চিকিৎসায় জেলাভিত্তিক আধুনিক সেবা ইউনিট তৈরি, বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ, স্বল্পমূল্যে ক্যানসারসহ জটিল রোগের ওষুধ এবং বিনামূল্যে দেশীয় টিকা সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পাশাপাশি মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পানি, পুষ্টি সচেতনতা, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্য খাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়নের পাশাপাশি হাম, ডেঙ্গু, জনবল সংকট, হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের অসম বণ্টনের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলা করাই এখন স্বাস্থ্য খাতের বড় পরীক্ষা।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন