গ্যাসে চলছে বাস, অথচ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ডিজেলচালিত বাসের সমান! রাজধানীতে মাত্র ১০ টাকার যাত্রায় দিতে হচ্ছে ১৫ টাকা, আবার কোথাও ২০ টাকার ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা। জ্বালানি হিসেবে সিএনজি ব্যবহার করেও কেন বাড়তি ভাড়া দিতে হবে যাত্রীদের? সরকারি সিদ্ধান্তে গ্যাসচালিত বাসের ভাড়া না বাড়লেও রাজধানীর বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানীর নতুনবাজার থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত চলাচলকারী রাইদা পরিবহনের একটি বাসে এমন ঘটনার অভিযোগ করেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, আগে এই পথে ভাড়া ছিল ১০ টাকা। কিন্তু সম্প্রতি বাসের কর্মী তাঁর কাছ থেকে ১৫ টাকা আদায় করেন। পরে চালকের আসনের সামনে সিএনজির মিটার চালু অবস্থায় দেখতে পান তিনি। অর্থাৎ, গ্যাসে চলা বাসে যাতায়াত করেও তাঁকে বাড়তি টাকা দিতে হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করেও বাসের কর্মীর কাছ থেকে সন্তোষজনক উত্তর পাননি বলে অভিযোগ তাঁর।
সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া বাড়ানো হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বড় বাসের প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বর্ধিত ভাড়া সিএনজিচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, ডিজেলের দাম বাড়ার অজুহাতে গ্যাসচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অনুমোদন নেই।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নতুনবাজার থেকে রামপুরা ব্রিজের দূরত্ব ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার। এই পথে নির্ধারিত ভাড়া সর্বোচ্চ ১২ টাকা হলেও অভিযোগ অনুযায়ী আদায় করা হচ্ছে ১৫ টাকা। ফলে একজন যাত্রীকে অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে ৩ টাকা। একটি বাসে একই দূরত্বে ৩০ জন যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩ টাকা করে নেওয়া হলে একবারের যাত্রাতেই বাড়তি আদায় দাঁড়ায় ৯০ টাকা। দিনে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটলে অতিরিক্ত ভাড়ার পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে।
শুধু নতুনবাজার ও রামপুরা নয়, রাজধানীর আরও বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। উত্তরা থেকে নদ্দা ও নতুনবাজার এলাকায় যাতায়াতকারী আমিনুল ইসলাম জানান, রাইদা, ভিক্টর ক্ল্যাসিক ও অনাবিল পরিবহনের কোনো কোনো বাসে আগে ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন ৩০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
এ ছাড়া উত্তরা আজমপুর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে আসাদগেট ও খামারবাড়ি রুটে চলাচলকারী ভিআইপি পরিবহনের ভাড়া ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে উত্তরা থেকে শাহবাগগামী এয়ারপোর্ট স্পেশাল সার্ভিসের ভাড়াও ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।
ফিলিং স্টেশন ও বাসকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর কিছু বাস এখনো সিএনজিতে চলাচল করে। রাইদা পরিবহন ও গ্রেট তুরাগের কয়েকটি বাস দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নেয় বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম জানিয়েছেন, গ্যাসচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানোর কোনো নির্দেশনা মালিক সমিতি কিংবা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ দেয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণসহ বাস পরিচালনার অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান ভাড়ায় উন্নত সেবা দেওয়া কঠিন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। পরিবহন খাতের ব্যয় কমাতে যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর হ্রাস এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে রুটভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট রুটে বাস পরিচালনা ও তদারকি সমন্বিত করা গেলে অনিয়ম কমানো সম্ভব। পাশাপাশি ই-টিকিটিং চালু হলে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া আদায়ের সুযোগও কমে আসবে।
সব মিলিয়ে, গ্যাসচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যাত্রীদের দাবি, কোন বাস কোন জ্বালানিতে চলছে এবং কোন রুটে কত ভাড়া নির্ধারিত—তা স্পষ্টভাবে জানানো ও কার্যকরভাবে তদারকি করা জরুরি। এখন দেখার বিষয়, বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগে কর্তৃপক্ষ বাস্তবে কতটা ব্যবস্থা নেয়।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন