কৃষি যদি লাভজনক না হয়, তাহলে কৃষকেরা কেন এই পেশায় থাকবেন? ফসল ফলিয়েও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা, আবার বীজ ও উৎপাদন উপকরণ কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষিকে লাভজনক করতে সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি এবং কৃষকদের জন্য আরও সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে কৃষি বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো থেকে শুরু করে ফসল সংরক্ষণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও জোর দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আয়োজনে কৃষি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, কৃষিকে লাভজনক করতে হলে সরকারকে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কৃষিতে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিতে হবে। যদিও বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে কৃষকদের সহায়তা ছাড়া কৃষি খাতকে টেকসই করা কঠিন বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষিতে যেসব ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে গবেষণার মাধ্যমে সমাধান বের করতে হবে। বর্তমানে কৃষকেরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে ফসল ফলানোর জন্য বীজসহ বিভিন্ন উপকরণ কিনতে তাঁদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে কৃষিকাজের খরচ বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কৃষকের আয় বাড়ছে না।
কৃষিতে শ্রমিক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, কৃষিকাজ করে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে কৃষিকে লাভজনক করে তোলা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, কৃষিপণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে পারলে উৎপাদনের পরপরই কম দামে ফসল বিক্রি করার চাপ কমবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।
কৃষি উৎপাদনের অগ্রগতি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, পেঁয়াজ চাষে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে এবং এখন আর আগের মতো আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফল উৎপাদনেও বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়ার মান উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কৃষকদের সচেতন করার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, জমিতে সারের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত বা অনুপযুক্ত ব্যবহার মাটির উর্বরতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশের কথা বিবেচনায় রেখে উন্নত কীটনাশক তৈরির গবেষণাও বাড়াতে হবে।
কৃষি বিজ্ঞানীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁদের কাজের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা জরুরি। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে হলেও কৃষি বিজ্ঞানীদের পেনশনের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। কারণ কৃষির উন্নয়নে গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিজ্ঞানীদের দক্ষতা কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মতবিনিময় সভায় কৃষিপণ্যের মান উন্নয়ন এবং রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, দেশে অনেক কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। এখন শুধু উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিপণ্য যেন দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছেও পৌঁছাতে পারে, সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।
এ ছাড়া কৃষির বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে গবেষণা জোরদার করা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সব মিলিয়ে, কৃষিকে লাভজনক করা, কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা, কৃষি বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ—এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এখন এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই হবে কৃষক ও কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন