ঢাকা | |

ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইট বাতিলে চরম বিপাকে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

একদিকে বিদেশের কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে না পারার দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া আর চাকরি হারানোর ভয়।
  • আপলোড সময় : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৯ সময়
  • আপডেট সময় : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৯ সময়
ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইট বাতিলে চরম বিপাকে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

একদিকে বিদেশের কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে না পারার দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া আর চাকরি হারানোর ভয়। কেউ কয়েক মাসের ছুটি কাটিয়ে সৌদি আরবে ফিরতে বিমানবন্দরে এসে দেখছেন তাঁর ফ্লাইট বাতিল। আবার কেউ বাধ্য হয়ে বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, গুনছেন অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এমন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বহু বাংলাদেশি কর্মী। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবগামী ও সংশ্লিষ্ট রুটের ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৮ হাজার ৩৬২ জন যাত্রী।


রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেখা যাচ্ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার চিত্র। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে অনেকে জানতে পারছেন, তাঁদের নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে কিংবা যাত্রার সময় অনিশ্চিত। হাতে টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কেউ বিমান সংস্থার কাউন্টারে ঘুরছেন, কেউ বিকল্প ফ্লাইটের খোঁজ করছেন, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করছেন।


টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মালেক এক মাসের ছুটি কাটিয়ে সৌদি আরবে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম টিকিট বাতিল হওয়ায় তাঁকে বিকল্প পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুবাই হয়ে মদিনায় যাওয়ার জন্য তাঁকে অতিরিক্ত ৮০ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে বড় সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা থেকেই এই বাড়তি ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তাঁকে।


একই ধরনের দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কুমিল্লার চান্দিনার শরীফ সরকার। তিন মাসের ছুটি শেষে সৌদি আরবে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারেন, রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরে তাঁকে জানানো হয়, বিকল্প ফ্লাইটে মদিনা হয়ে দাম্মামে পাঠানোর চেষ্টা করা হবে। তাঁর আশঙ্কা, আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সৌদি আরবে ফিরে চাকরি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।


নাটোরের আতিকুল ইসলাম প্রথমবারের মতো চাকরি নিয়ে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। আবারও বিমানবন্দরে এসে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন তিনি। ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য নিজের সর্বস্ব ব্যয় করেছেন তাঁর বাবা আদম আলী। ছেলের যাত্রা আটকে গেলে কী হবে, সেই দুশ্চিন্তায় তিনিও উদ্বিগ্ন।


নোয়াখালীর আব্দুল মান্নানও ছুটি শেষে রিয়াদে ফেরার জন্য টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে চাকরি নিয়ে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। তাঁর মতে, ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমত।


বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে মোট ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি সরাসরি ফ্লাইট এবং ৬৬টি ট্রানজিট ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটের ১৮ হাজার ৩৬২ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিকল্প রুটে যাত্রার চাহিদা বাড়ায় কোথাও কোথাও টিকিটের খরচও বেড়ে যাচ্ছে, যা কর্মীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে।


বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা চলতে পারে।


এদিকে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের বিনা অতিরিক্ত খরচে সমন্বয় করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ করে যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।


বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতেও সৌদি আরবের গুরুত্ব অনেক। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাবে, চলতি বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। শুধু সৌদি আরবগামী কর্মীদের ছাড়পত্র কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৫৮৫ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি।


তাই ফ্লাইট চলাচলের এই সংকট শুধু বিমানবন্দরে আটকে থাকা যাত্রীদের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের জীবিকা, কর্মীদের চাকরি এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ফ্লাইটের সময়সূচি সম্পর্কে দ্রুত নিশ্চিত তথ্য দেওয়া, বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করা এবং যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের জন্য কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
'ইন্ডিয়া' জোটের রাজপথের আন্দোলনে থালাপতি বিজয়ের দল

'ইন্ডিয়া' জোটের রাজপথের আন্দোলনে থালাপতি বিজয়ের দল