১৯৮০ সাল থেকে জাতিসংঘ পরিবার-সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৮৩ সালে সামাজিক উন্নয়ন কমিশনের ১৯৮৩/২৩ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবারের ভূমিকা নিয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় জাতিসংঘ মহাসচিবের সহযোগিতায় পরিবার বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ১৯৮৫ সালের ২৯ মে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের একটি রেজুলেশনের মাধ্যমে “উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবার” বিষয়টি সাধারণ পরিষদে আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়। এতে সরকার, আন্তঃসরকারি সংস্থা, এনজিও এবং সাধারণ জনগণের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরার অনুরোধ জানানো হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রেজুলেশনের মাধ্যমে ১৯৯৪ সালকে আন্তর্জাতিক পরিবার বর্ষ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে প্রতি বছর ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এ দিবস উপলক্ষে সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র্যালির মাধ্যমে পরিবারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পরিবারের উৎপত্তি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের মতে, পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্র কোনো চিরস্থায়ী মানবিক কাঠামো নয়; বরং অর্থনৈতিক বিকাশের নির্দিষ্ট পর্যায়ে এগুলোর উদ্ভব হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্পবিপ্লব ও নগরায়ণ পরিবার কাঠামোতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে। কৃষিভিত্তিক সমাজে যৌথ পরিবার ছিল সাধারণ, যেখানে সবাই মিলে উৎপাদন ও জীবনযাপন করত। কিন্তু শিল্পায়নের ফলে মানুষ শহরমুখী হওয়ায় একক পরিবারের (Nuclear Family) বিস্তার ঘটে। এই পরিবর্তনের ফলে একদিকে নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে পারিবারিক বন্ধন শিথিল, বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি এবং প্রবীণদের একাকীত্বের মতো সমস্যাও তৈরি হয়েছে। শিশুদের সামাজিকীকরণেও পরিবর্তন এসেছে, যেখানে যৌথ পরিবারের পরিবর্তে ডে-কেয়ার বা কাজের সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
অন্যদিকে নগরায়ণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যস্ত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করেছে। ফলে আত্মীয়তার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং মানসিক চাপ, একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক পরিবারগুলো শিক্ষার গুরুত্ব, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে ছোট ও গুণগত পরিবার গঠনের দিকে এগিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ পরিবার কাঠামোকে পরিবর্তন করলেও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি। বরং আধুনিক যুগে পরিবারকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক বন্ধন বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন